চীনে এক ব্যক্তির ফ্ল্যাট কেনার অভিজ্ঞতা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৪৩ লাখ টাকা সমমূল্যের অর্থ ব্যয় করে তিনি একটি ভবনের ৩৪তম তলায় ফ্ল্যাট কিনেছিলেন। কিন্তু কয়েক বছর পর জানতে পারেন, যে ভবনে তিনি ফ্ল্যাট কিনেছেন সেটি বাস্তবে মাত্র ৩২ তলা বিশিষ্ট। ফলে ফ্ল্যাটের পাশাপাশি নিজের বিনিয়োগ করা অর্থও হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন তিনি।
জানা গেছে, শেন নামের ওই ব্যক্তি ২০১৩ সালে চীনের শানসি প্রদেশের শিয়ানের কাছাকাছি একটি এলাকায় প্রায় ৯০ বর্গমিটারের একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করেন। ফ্ল্যাটটির দাম ছিল প্রতি বর্গমিটার ২ হাজার ৬৪৬ ইউয়ান, যা স্থানীয় বাজারদরের তুলনায় অনেক কম ছিল। কম মূল্যের কারণ হিসেবে প্রকল্পটিকে ‘সীমিত সম্পত্তি অধিকার’ ভিত্তিক আবাসন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রকল্প সাধারণত গ্রামীণ সমবায়ী মালিকানাধীন জমিতে গড়ে ওঠে এবং অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন বা আইনি স্বীকৃতি থাকে না। ফলে এসব আবাসনের মালিকরা প্রচলিত সম্পত্তির মতো আইনি সুরক্ষা পান না এবং ভবিষ্যতে বিক্রির ক্ষেত্রেও নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন।
ফ্ল্যাট বুকিংয়ের সময় শেন প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৭০০ ইউয়ান অগ্রিম পরিশোধ করেন। তার দাবি, নির্মাতা প্রতিষ্ঠান তাকে আশ্বাস দিয়েছিল যে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নথিপত্র পরবর্তীতে সংগ্রহ করা হবে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৫ সালে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের কথা থাকলেও নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১৭ সালে তিনি জানতে পারেন, প্রকল্পের ভবনটি মাত্র ৩২ তলা পর্যন্ত নির্মিত হয়েছে। অর্থাৎ তিনি যে ৩৪তম তলার ফ্ল্যাট কিনেছিলেন, বাস্তবে সেই তলার কোনো অস্তিত্বই নেই।
পরিস্থিতি সামাল দিতে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান প্রথমে তাকে ৩২তম তলায় একটি বিকল্প ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ইউনিট অন্য এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।
এরপর শেন তার পরিশোধ করা অর্থ ফেরত চাইলেও প্রতিষ্ঠানটি আর্থিক সংকটের অজুহাতে সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দিতে রাজি হয়নি। কয়েক দফায় তিনি কিছু অর্থ ফেরত পেলেও বড় অংশ বকেয়া থেকে যায়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
বিষয়টি স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নজরে এলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে বকেয়া অর্থ এবং অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি পুরো অর্থ ফেরত পাননি।
স্থানীয় আদালত পরে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক বিধিনিষেধ আরোপ করলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানের নামে উল্লেখযোগ্য কোনো নিবন্ধিত সম্পদ বা সঞ্চয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও শেন এখনও তার বিনিয়োগের পুরো অর্থ কিংবা প্রতিশ্রুত ফ্ল্যাট—কোনোটিই পাননি। ঘটনাটি চীনে স্বল্পমূল্যের কিন্তু আইনি সুরক্ষাহীন আবাসন প্রকল্পে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা ক্রেতাদের যেকোনো সম্পত্তি কেনার আগে জমির মালিকানা, সরকারি অনুমোদন এবং আইনি নথিপত্র যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন।
