আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল: ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তে ভয়াবহ অবহেলার প্রমাণ

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শেষে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের একাধিক গুরুতর অবহেলার বিষয় উঠে এসেছে।

কী ঘটেছিল?

গত ২৭ মে ২০২৬, কোরবানির ঈদের আগের দিন ভোররাতে হাসপাতালটির পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে একের পর এক ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। মৃত শিশুদের বয়স ছিল মাত্র ১ থেকে ৪ দিনের মধ্যে। তারা সবাই সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল এবং প্রাথমিকভাবে সুস্থ ছিল বলে জানা যায়।

ঘটনার পরপরই অভিভাবকদের অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে।

তদন্তে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্য

সরকারি তদন্তে বেশ কয়েকটি গুরুতর ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, একাধিক অবহেলা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার সমন্বয়েই এই মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

ভেন্টিলেশন ও অক্সিজেন সংকট

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে কয়েক ঘণ্টা ধরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ ছিল। ওয়ার্ডটি ছিল প্রায় সম্পূর্ণ বদ্ধ এবং সেখানে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক বাতাস চলাচলের সুযোগ ছিল না। এতে কক্ষের পরিবেশ নবজাতকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

অতিরিক্ত রোগীর চাপ

প্রায় ৯০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে মা, নবজাতক ও স্বজন মিলিয়ে ৫০ জনেরও বেশি মানুষ অবস্থান করছিলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিবেশ নবজাতকদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যমানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকের অনুপস্থিতি

তদন্তে আরও জানা যায়, ঘটনার সময় ওয়ার্ডে কোনো ডিউটি চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন না। শিশুদের শারীরিক অবস্থার অবনতি শুরু হওয়ার পরও দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নার্স ও স্টাফদের অবহেলা

অভিভাবকদের অভিযোগ এবং তদন্ত প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে ওঠার পরও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা ছিল। রোগী ব্যবস্থাপনা ও জরুরি সেবা প্রদানে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।

অবকাঠামোগত ত্রুটি

তদন্ত কমিটি হাসপাতালের ভবন ও ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। রোগী ধারণক্ষমতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা পরিবেশের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির অসামঞ্জস্যের বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের কঠোর পদক্ষেপ

ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তাদের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ১১ জুন ২০২৬ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের অন্যত্র স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অবহেলার কারণে জীবনহানি ঘটলে ভবিষ্যতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তকে বেআইনি দাবি করেছে এবং আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি নিহত নবজাতকদের পরিবারকে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিপূরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের ব্যর্থতা নয়; বরং দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

নবজাতক ও নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, অক্সিজেন সরবরাহ, ভেন্টিলেশন এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে লাইসেন্স নবায়ন ও নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থাও আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে?

স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনার পর দেশের অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নজরদারি বাড়তে পারে। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা এবং কঠোর তদারকির উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, স্বচ্ছ বিচার এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।