হরমুজ প্রণালিতে টোল বসানোর হুমকি ট্রাম্পের: বৈশ্বিক তেলবাজার ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা

মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতা বা চূড়ান্ত চুক্তি ব্যর্থ হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র অঞ্চলটির ‘গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল’ বা অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। সেই ব্যয়ের একটি অংশ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনায় আনা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।

ট্রাম্পের মতে, ইরানের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রকে বিকল্প কৌশল গ্রহণ করতে হবে। এর অংশ হিসেবেই তিনি এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন।

কেন গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডোরগুলোর একটি। পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং ইরানের জ্বালানি রপ্তানির বড় অংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা বা নিরাপত্তা সংকট সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে।

টোল আরোপ কতটা বাস্তবসম্মত?

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত। ফলে কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সেখানে একতরফাভাবে টোল আরোপ করা সহজ নয়। এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন, আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান এবং জাতিসংঘ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে অনেকে সরাসরি নীতিগত ঘোষণা হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও বিবেচনা করছেন। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই ধরনের বক্তব্য দেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তেলবাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। অতীতে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা কিংবা জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলেই অপরিশোধিত তেলের বাজারে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, টোল আরোপের মতো কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত না হলেও শুধু এ ধরনের রাজনৈতিক হুমকিই বিনিয়োগকারী ও জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। এর প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?

মধ্যপ্রাচ্যের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো সাধারণত হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার পক্ষে অবস্থান নেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য টোল আরোপের ধারণা বাস্তব রূপ পেলে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক আলোচনা ও মতবিরোধের সৃষ্টি হতে পারে।

একই সঙ্গে ইরানও এ ধরনের বক্তব্যকে নিজেদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখতে পারে। ফলে ওয়াশিংটন-তেহরান সম্পর্ক আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ভূরাজনৈতিক বার্তা কী?

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপস্থিতি এবং নিরাপত্তা ব্যয়ের প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি মূলত এই বার্তা দিতে চেয়েছেন যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ভূমিকা পালন করে, তার আর্থিক মূল্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে বহন করা উচিত।

তবে বাস্তবে হরমুজ প্রণালিতে টোল আরোপের মতো পদক্ষেপ কতটা কার্যকর বা আইনগতভাবে সম্ভব, তা নিয়ে এখনো ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। তবুও ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।