গাজার দক্ষিণাঞ্চলের রাফাহ এলাকায় প্রস্তাবিত ‘গ্রিন রাফাহ’ প্রকল্প ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, অবকাঠামো উন্নয়নের নামে নেওয়া এই উদ্যোগের পেছনে গাজার ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিকল্পনা থাকতে পারে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাফাহর পূর্বাঞ্চলে পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের সম্পৃক্ত করার কথা থাকলেও তাদের কঠোর নিরাপত্তা যাচাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
‘গ্রিন রাফাহ’ প্রকল্প নিয়ে কেন উদ্বেগ
রাফাহ গাজার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও প্রবেশ অঞ্চল। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে এলাকাটির অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে পানি, বিদ্যুৎ ও পয়োনিষ্কাশনের মতো মৌলিক পরিষেবা পুনঃস্থাপন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন হলো, এসব অবকাঠামো কোথায়, কীভাবে এবং কোন প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হবে। তাদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট এলাকাকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে গাজার বিভিন্ন অংশের মধ্যে যোগাযোগ ও চলাচল আরও সীমিত হতে পারে।
পুনর্গঠন নাকি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নতুন কাঠামো?
গাজা পুনর্গঠন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। যুদ্ধের ফলে আবাসন, স্বাস্থ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও স্যানিটেশন অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই যেকোনো পুনর্গঠন উদ্যোগে বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, পুনর্গঠন কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিভিন্ন বিধিনিষেধকে যদি রাজনৈতিক বা নিরাপত্তাগত শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাস্তুচ্যুতি নিয়ে বড় প্রশ্ন
গাজা যুদ্ধের অন্যতম বড় মানবিক সংকট হলো ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি। বহু মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তারা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজ এলাকায় ফিরতে পারবেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পুনর্গঠন ও অবকাঠামো ব্যবস্থাপনাকে যদি মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে সাময়িক বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে।
গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
‘গ্রিন রাফাহ’ নিয়ে বিতর্ক মূলত গাজার যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎকে ঘিরে। অবকাঠামো পুনর্গঠন যদি স্থানীয় জনগণের প্রয়োজন, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে পরিচালিত হয়, তাহলে তা মানবিক পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে, একই অবকাঠামো যদি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণ, চলাচলে বিধিনিষেধ বা ভূখণ্ডভিত্তিক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তা গাজার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ‘গ্রিন রাফাহ’ প্রকল্পের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে এর পূর্ণাঙ্গ নকশা, বাস্তবায়ন কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাফাহর যেকোনো পুনর্গঠন উদ্যোগে স্বচ্ছতা, বেসামরিক জনগণের অধিকার, নিরাপদ প্রত্যাবর্তন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক নীতিমালা নিশ্চিত করা জরুরি।
