প্রত্নতত্ত্বের নামে ফিলিস্তিনি ভূমি দখলের অভিযোগ, ইসরায়েলকে ঘিরে উদ্বেগ

অধিকৃত পশ্চিম তীরের প্রাচীন সেবাস্তিয়া প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানকে ঘিরে ইসরায়েলের ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও জাতীয় উদ্যান নির্মাণের কথা বলা হলেও স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, এর আড়ালে তাদের ঐতিহ্যবাহী ও পৈতৃক জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

সেবাস্তিয়া পশ্চিম তীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা। প্রাচীন সামারিয়া নগরীর সঙ্গে যুক্ত এই স্থানটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাম্প্রতিক ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের প্রশ্নের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সেবাস্তিয়ার আশপাশে প্রায় ৪৫০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ‘সমারিয়া ন্যাশনাল পার্ক’ নামে পরিচিত।

প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ নাকি ভূমি নিয়ন্ত্রণ?

পশ্চিম তীরে প্রত্নতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। এই অঞ্চলের মাটির নিচে থাকা প্রাচীন স্থাপনা, নগরীর ধ্বংসাবশেষ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সাধারণভাবে দ্বিমত নেই।

তবে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সংরক্ষণের পদ্ধতি এবং এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। সমালোচকদের যুক্তি, কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাকে জাতীয় উদ্যান বা বিশেষ সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হলে স্থানীয় জনগণের জমি ব্যবহারের অধিকার সীমিত হতে পারে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অঞ্চলে এমন পদক্ষেপ কেবল সাংস্কৃতিক সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ না থেকে ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমালোচকরা।

ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ

স্থানীয় ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভূমি অধিগ্রহণ কার্যকর হলে তারা নিজেদের জমিতে প্রবেশ ও তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারেন। তাদের অভিযোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের সুরক্ষার বিষয়টিকে ব্যবহার করে ওই এলাকার ওপর ইসরায়েলি প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করা হচ্ছে।

ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের মতে, একবার জমি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ভবিষ্যতে পর্যটন অবকাঠামো, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর জমির ওপর বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউনেস্কোর উদ্বেগ

সেবাস্তিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃত। স্থানটির সংরক্ষণ, ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যান প্রকল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার নামে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং তাদের ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় সংরক্ষণ প্রকল্পই স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নতুন সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

হেরোডিয়ামেও ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ

শুধু সেবাস্তিয়া নয়, পশ্চিম তীরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হেরোডিয়াম ঘিরেও ভূমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে প্রায় ৮০ একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে।

ইসরায়েলি অধিকারকর্মী ও সমালোচকদের অভিযোগ, পশ্চিম তীরের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাগুলোকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বসতি সম্প্রসারণ ও ভূমি ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।

ইতিহাসের সুরক্ষা নাকি রাজনৈতিক ব্যবহার?

পশ্চিম তীরের বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য কি কেবল ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি সেটিকে রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত উদ্দেশ্যেও কাজে লাগানো হচ্ছে?

ইসরায়েলের পক্ষ থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণ, পর্যটন উন্নয়ন ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য রক্ষার যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ফিলিস্তিনি পক্ষের অভিযোগ, একই উদ্যোগ তাদের জমি ও বসতভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করছে।

এই বিরোধের কারণে সেবাস্তিয়া এখন কেবল একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পশ্চিম তীরে ভূমি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান বৃহত্তর সংঘাতের অংশ হয়ে উঠেছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রকল্প যদি স্থানীয় জনগণের অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সেটি সংরক্ষণ উদ্যোগের বদলে নতুন রাজনৈতিক বিরোধের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের মতো দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্রত্নতত্ত্বের ব্যবহার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও স্বচ্ছতার প্রশ্নের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।