পর্তুগালে জনসমক্ষে বোরকা-নিকাবসহ মুখ ঢেকে রাখার পোশাক নিষিদ্ধের উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। শুধু পর্তুগাল নয়, বিশ্বের সব দেশেই বোরকা নিষিদ্ধ হওয়া উচিত বলে মত দিয়েছেন তিনি।
পর্তুগালে বোরকা নিষিদ্ধের উদ্যোগ
পর্তুগালের পার্লামেন্টে জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখার পোশাক নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ অনুমোদিত হয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন ও ডানপন্থী কয়েকটি দল এই প্রস্তাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আইনটির মূল লক্ষ্য জনসমক্ষে মানুষের পরিচয় শনাক্ত করা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বলে সমর্থকদের দাবি।
তবে বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনেও মতবিরোধ রয়েছে। বিরোধী পক্ষ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর একটি অংশ মনে করছে, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিস্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তসলিমা নাসরিনের প্রতিক্রিয়া
পর্তুগালের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তসলিমা নাসরিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর হলো, নারীর মুখ ও ব্যক্তিসত্তাকে আড়াল করে রাখার সংস্কৃতি বন্ধ হওয়া উচিত।
তসলিমা নাসরিন দীর্ঘদিন ধরেই ধর্মীয় রক্ষণশীলতা এবং নারীর ওপর সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিনিষেধের সমালোচনা করে আসছেন। বোরকা ও নিকাব নিয়েও তাঁর অবস্থান বরাবরই স্পষ্ট ও বিতর্কিত।
কী নিয়ে বিতর্ক?
পর্তুগালের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে মূল বিতর্ক তৈরি হয়েছে নারীর স্বাধীনতা, ধর্মীয় অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে। নিষেধাজ্ঞার সমর্থকদের মতে, জনসমক্ষে মুখ শনাক্ত করা নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বিরোধীদের যুক্তি, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের পছন্দ ও বিশ্বাস অনুযায়ী পোশাক নির্বাচন করলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা নিষিদ্ধ করা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের শামিল হতে পারে।
ইউরোপে মুখ ঢাকা পোশাক নিয়ে বিধিনিষেধ
পর্তুগালের উদ্যোগটি ইউরোপে একেবারে নতুন ঘটনা নয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় জনসমক্ষে মুখ ঢাকার পোশাকের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। তবে দেশভেদে আইনের ধরন, প্রয়োগের ক্ষেত্র এবং শাস্তির বিধান ভিন্ন।
তাই পর্তুগালের সিদ্ধান্তকে সব ধরনের ইসলামি পোশাক নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল বিষয়টি হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জনসমক্ষে মুখ ঢেকে রাখার ওপর বিধিনিষেধ।
নারীর স্বাধীনতা বনাম রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ
তসলিমা নাসরিনের মন্তব্যের পর আবারও সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নারীর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত? একজন নারীকে বোরকা বা নিকাব পরতে বাধ্য করা যেমন প্রশ্নের জন্ম দেয়, তেমনি নিজের ইচ্ছায় পরতে চাইলে সেটি নিষিদ্ধ করাও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তৈরি করে।
ফলে পর্তুগালের সিদ্ধান্তকে ঘিরে বিতর্ক শুধু বোরকা বা নিকাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নারীর অধিকার ও জননিরাপত্তা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তসলিমা নাসরিনের ‘গোটা পৃথিবীতে বোরকা নিষিদ্ধ হোক’ মন্তব্য তাই পর্তুগালের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে চলমান আন্তর্জাতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
