৮ মাসে ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার: বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজ ও হত্যার ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

দেশে শিশু নিখোঁজ, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার একের পর এক ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য সামনে এসেছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় মোট ১৫৫ শিশু নিহত হওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হলেও ২ হাজার ৩৮ শিশু তখনও নিখোঁজ ছিল।

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

নিখোঁজ হওয়া প্রতিটি শিশুর ঘটনা যে হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়, এমনটি বলা যাবে না। অনেক শিশু পরিবারের কাছে ফিরে আসে বা বিভিন্ন কারণে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু নিখোঁজের পরও যখন হাজারো শিশুর সন্ধান পাওয়া যায় না এবং কিছু শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়, তখন বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।

পুলিশের হিসাবে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ০ থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হলেও ৬৮ জন তখনও নিখোঁজ ছিলেন। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নিখোঁজের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ২৪৩।

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড

সম্প্রতি কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটির বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে।

তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার উদ্দেশ্য বা ঘটনার সম্পূর্ণ কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধারের জন্য প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

নিখোঁজের পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর সময় যত গড়ায়, তার অবস্থান শনাক্ত করা তত কঠিন হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত সাধারণ ডায়েরি, ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, মোবাইল ও ডিজিটাল সূত্র যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তির ব্যবহারও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি, পরিবহন ব্যবস্থার তথ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল সূত্র দ্রুত বিশ্লেষণ করা গেলে নিখোঁজ শিশুর সম্ভাব্য অবস্থান শনাক্ত করার সুযোগ বাড়তে পারে।

নিখোঁজ শিশুকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত প্রয়োজন

শিশু নিজে থেকে বাড়ি ছেড়ে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা থাকলেও প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনাকে শুরুতেই গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ কোনো শিশু পারিবারিক কারণে চলে গেছে, নাকি অপরাধের শিকার হয়েছে—তা তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

নিখোঁজের অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান শুরু করা এবং পরিবারের কাছ থেকে শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, পোশাক, মোবাইল নম্বর, বন্ধু বা পরিচিতদের তথ্য সংগ্রহ করা অনুসন্ধানকে আরও কার্যকর করতে পারে।

৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধারের তথ্য কী বলছে?

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিখোঁজের পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ১৫৫ শিশু নিহত হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। এসব পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে।

তবে মানবাধিকার সংগঠনের পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য এবং পুলিশের প্রশাসনিক তথ্য একই ধরনের ডেটাসেট নয়। তাই দুটি সংখ্যাকে সরাসরি তুলনা করে শিশু নিখোঁজ থেকে হত্যার কোনো নির্দিষ্ট হার নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।

বাস্তবতা বুঝতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য

শিশু নিখোঁজ ও হত্যার প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে নিয়মিত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ। কত শিশু নিখোঁজ হয়েছে, কতজন উদ্ধার হয়েছে, কতজন এখনও নিখোঁজ এবং কতটি ঘটনায় অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এসব তথ্য আলাদাভাবে প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

কারণ প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অপেক্ষা এবং একটি শিশুর জীবন।

শেষ প্রশ্ন: একটি শিশু নিখোঁজ হলে আমরা কতটা দ্রুত নড়ছি?

১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজের খবর, ২ হাজার ৩৮ শিশুর তখনও নিখোঁজ থাকা এবং নিখোঁজের পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা—সবকিছু মিলিয়ে শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি এখন জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর দ্রুত অনুসন্ধান, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে অনেক ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ছোট করে না দেখে দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা। কারণ একটি শিশুর ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার দেরিও কখনো কখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।