দক্ষিণ কোরিয়া: একটি মসজিদ নির্মাণকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ কোরিয়ার দাইগু শহরে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। নির্মাণস্থলের সামনে শুয়োরের মাংস রান্না করে খাওয়া এবং এর আগে শুয়োরের মাথা রেখে প্রতিবাদ জানানোর মতো ঘটনায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। কয়েক বছর ধরে চলা এই বিরোধের এখনও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার দাইগু শহরের বুক জেলার দাইহিয়ন-ডং এলাকায় অবস্থিত ক্যংবুক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির কাছাকাছি মসজিদটি নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয় ২০২০ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বিদেশি মুসলিম শিক্ষার্থীদের নামাজ আদায়ের জন্য এই ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে নির্মাণের অনুমতিও পাওয়া যায়।
মসজিদ নির্মাণে আপত্তি স্থানীয় বাসিন্দাদের
মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা সামনে আসার পর থেকেই এলাকার একাংশের বাসিন্দা এর বিরোধিতা শুরু করেন। তাঁদের দাবি, আবাসিক এলাকায় মসজিদ নির্মিত হলে শব্দদূষণ, পরিবেশগত সমস্যা এবং আশপাশের এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে এসব আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য; এগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
অন্যদিকে, মুসলিম শিক্ষার্থী ও তাঁদের সমর্থনে থাকা নাগরিক সংগঠনগুলোর বক্তব্য, আইন মেনে ধর্মীয় উপাসনালয় নির্মাণের অধিকার সবারই থাকা উচিত। তাঁদের মতে, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনও সম্প্রদায়কে উপাসনালয় নির্মাণ থেকে বঞ্চিত করা বৈষম্যমূলক আচরণ হতে পারে।
নির্মাণস্থলে শুয়োরের মাংস রান্না করে প্রতিবাদ
মসজিদ নির্মাণবিরোধী আন্দোলনের সময় কয়েকটি ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে নির্মাণস্থলের সামনে শুয়োরের মাংসের বারবিকিউ আয়োজন করেন প্রতিবাদকারীদের একাংশ। ২০২৩ সালেও একই ধরনের প্রতিবাদ দেখা যায়। এর আগে নির্মাণস্থলের কাছে শুয়োরের মাথা রাখার ঘটনাও সামনে এসেছিল।
ইসলাম ধর্মে শুয়োরের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ায় মুসলিম সম্প্রদায়ের অনেকেই এই ধরনের প্রতিবাদকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে, প্রতিবাদকারীদের একাংশ নিজেদের কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিগত বা সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রকাশ বলে দাবি করেছেন। এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, প্রতিবাদের অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের প্রতি আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বারবার থমকে গেছে নির্মাণকাজ
বিরোধের পাশাপাশি নির্মাণকাজে কারিগরি ও প্রশাসনিক জটিলতাও দেখা দেয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ না হওয়া এবং ভবনের দ্বিতীয় তলার ইস্পাত কাঠামোতে নির্দিষ্ট কিছু স্টাড বোল্টের ঘাটতির অভিযোগে প্রশাসন কাজ বন্ধের নির্দেশ দেয়। ফলে মসজিদটির নির্মাণ দীর্ঘ সময় ধরে স্থগিত রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করার বিষয়ে প্রশাসনিক কমিটি নতুন করে পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই এবং আশপাশের বাড়ির দেয়ালের ক্ষতি নিয়ে অভিযোগের নিষ্পত্তির বিষয়টিও বিবেচনায় আসে।
মসজিদ স্থানান্তরের প্রস্তাব, সমাধানের অপেক্ষা
২০২৬ সালের ১০ আগস্ট দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়োনহাপ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে জানানো হয়, দাইগুর বুক জেলা প্রশাসন বিরোধ নিরসনের বিকল্প হিসেবে মসজিদটি অন্য স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। পুরোনো দাইহিয়ন থানা ভবনের জমি ব্যবহারের সম্ভাবনাও আলোচনায় আসে। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ওপর।
দীর্ঘদিনের এই বিরোধে একদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তি ও নির্মাণসংক্রান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন, অন্যদিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার দাবি—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
উপসংহার
দক্ষিণ কোরিয়ার দাইগু শহরের এই ঘটনা শুধু একটি মসজিদ নির্মাণের বিরোধ নয়; এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা, স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ, নির্মাণবিধি এবং সামাজিক সহাবস্থানের জটিল প্রশ্নও সামনে এনেছে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: Korea JoongAng Daily, Yonhap News Agency-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন।
