পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সিলেবাসে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। ২০২৭ সালের নতুন শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটি বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস ও বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ের পাঠ্যক্রমে একাধিক সংশোধনের সুপারিশ করেছে।
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পরিবর্তে ‘শিবাজী উৎসব’ অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ। একই সঙ্গে শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকের জায়গায় দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘মেবার পতন’ রাখার প্রস্তাবও রয়েছে।
‘আফ্রিকা’র বদলে ‘শিবাজী উৎসব’
মাধ্যমিক স্তরের বাংলা সাহিত্য পাঠ্যক্রমে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আফ্রিকা’ কবিতার পরিবর্তে তাঁরই লেখা ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে শিক্ষামহল থেকে রাজনৈতিক মহল—সব জায়গাতেই তৈরি হয়েছে আলোচনা।
কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন শিক্ষাক্রমে ভারতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ এবং সনাতনী পরম্পরার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি পরিচয় করানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রস্তাবটি এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; সরকারের অনুমোদনের পরই পরিবর্তনগুলি কার্যকর হওয়ার কথা।
‘সিরাজদ্দৌলা’র পরিবর্তে ‘মেবার পতন’
বাংলা সাহিত্যের নাট্যাংশেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ‘সিরাজদ্দৌলা’র পরিবর্তে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ঐতিহাসিক নাটক ‘মেবার পতন’ পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ফলে বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইতিহাস ও ঐতিহাসিক চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলির উপস্থাপনাতেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী
প্রস্তাবিত পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবন ও অবদান। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, প্রতিটি শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের শুরুতে তাঁর জীবন ও অবদান নিয়ে একটি অংশ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরেও রাজনৈতিক ও শিক্ষামহলে মতভেদ তৈরি হয়েছে। সমর্থকদের বক্তব্য, ভারতীয় রাজনীতি ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের জানা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধীদের প্রশ্ন, তাঁকে পাঠ্যবইয়ে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা হবে।
সিঙ্গুর আন্দোলন ও কন্যাশ্রী নিয়ে প্রস্তাব
পাঠ্যক্রমে সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের কিছু বিষয় নিয়েও পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গুর আন্দোলন এবং কন্যাশ্রী প্রকল্প সংক্রান্ত পাঠ্যাংশ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
এই দুটি বিষয়ই রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হওয়ায় প্রস্তাবটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
মুঘল ইতিহাস ও কমিউনিজমের অধ্যায়েও পরিবর্তন
প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষাক্রমে মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস এবং কমিউনিজম বা বামপন্থী আন্দোলনের বিষয়বস্তু নিয়েও পরিবর্তনের কথা উঠে এসেছে। মুঘল ইতিহাস সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশ রাখার পাশাপাশি কমিউনিজম সম্পর্কিত পাঠও সংক্ষিপ্ত করার প্রস্তাব রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছে।
বাংলা পাঠ্যবইয়ের ভাষাতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব
শুধু সাহিত্য বা ইতিহাস নয়, পাঠ্যবইয়ের ভাষা নিয়েও কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ‘পানি’, ‘আম্মা’, ‘আব্বা’-র মতো শব্দের পরিবর্তে অন্য শব্দ ব্যবহারের প্রস্তাবের কথা উঠে এসেছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলা ভাষার দীর্ঘ ইতিহাসে বিভিন্ন অঞ্চল, সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির শব্দ মিশে রয়েছে। তাই পাঠ্যবইয়ে কোন শব্দ থাকবে বা থাকবে না, তা নিয়ে ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদদের মতামতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২৭ থেকেই কি নতুন সিলেবাস?
সিলেবাস-কাম-কারিকুলাম কমিটির প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাক্রমের কিছু পরিবর্তন কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্তভাবে কোন কোন প্রস্তাব অনুমোদিত হবে, তা সরকারের সিদ্ধান্তের পরই স্পষ্ট হবে।
তাই বর্তমানে ‘আফ্রিকা বাদ পড়ছে’, ‘সিঙ্গুর-কন্যাশ্রী বাদ’, বা ‘নতুন সিলেবাস কার্যকর হয়ে যাচ্ছে’—এমন ভাষার পরিবর্তে এগুলিকে ‘বাদ দেওয়ার সুপারিশ’ বা ‘পরিবর্তনের প্রস্তাব’ হিসেবে উল্লেখ করাই বেশি নির্ভুল।
কেন এই পরিবর্তন নিয়ে এত বিতর্ক?
পাঠ্যক্রমে কোন সাহিত্যকর্ম, ঐতিহাসিক ঘটনা বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব জায়গা পাবেন—তা শুধুমাত্র শিক্ষাবিষয়ক সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি প্রজন্ম কীভাবে ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক ঘটনাকে চিনবে, সেই প্রশ্নও।
একদিকে কমিটির প্রস্তাবকে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে শিক্ষার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকদের প্রশ্ন, এই পরিবর্তনের ফলে কি পাঠ্যক্রমে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে?
এই বিতর্কের চূড়ান্ত উত্তর পেতে হলে সরকারের অনুমোদিত চূড়ান্ত সিলেবাস প্রকাশ হওয়া এবং নতুন পাঠ্যবইয়ে বিষয়গুলি কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা দেখা জরুরি।
শেষ কথা
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল সিলেবাসে প্রস্তাবিত পরিবর্তনকে ঘিরে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের আগে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘আফ্রিকা’র পরিবর্তে ‘শিবাজী উৎসব’, ‘সিরাজদ্দৌলা’র জায়গায় ‘মেবার পতন’, পাঠ্যবইয়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী এবং সিঙ্গুর-কন্যাশ্রী সংক্রান্ত বিষয় বাদ দেওয়ার প্রস্তাব—প্রতিটি সিদ্ধান্তই আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মনে রাখতে হবে, এগুলি বর্তমানে কমিটির সুপারিশ ও প্রস্তাব। চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এবং অনুমোদিত পাঠ্যক্রম প্রকাশের পরই পশ্চিমবঙ্গের স্কুল শিক্ষায় ঠিক কী কী পরিবর্তন কার্যকর হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।
